চলমান রাজনৈতিক সংকট কাটাতে সংলাপের বিকল্প নেই

গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার প্রত্যাশায় ‘রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার লক্ষ্যে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।

চলমান রাজনৈতিক সংকট কাটাতে সংলাপের বিকল্প নেই

প্রথম নিউজ, অনলাইন: চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের বিকল্প নেই বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেছেন, একমাত্র সংলাপের মাধ্যমেই সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। যুদ্ধের মধ্যেও সংলাপ হয়। এজন্য প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে ছাড় দিতে হবে। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার প্রত্যাশায় ‘রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার লক্ষ্যে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের আয়োজনে এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সহযোগিতায় এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দি হাঙ্গার প্রজেক্টের ভোটার সচেতনতা ও নাগরিক সক্রিয়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

স্বাগত বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংলাপের বিকল্প হলো সংলাপ। নাগরিকদের মতো আমরাও মনে করি, আলোচনার টেবিলে বসেই সমস্যার সমাধান হওয়া দরকার। আমরা কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি না। তবে আমাদের প্রস্তাবগুলো সম্ভাব্য আলোচনার এজেন্ডা হতে পারে। সাবেক বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, নব্বইয়ে প্রণীত রূপরেখায় বলা হয়েছিল, আমরা ভবিষ্যতের সমস্যা সমাধানে আলাপ-আলোচনা করেই সমাধান করবো। কিন্তু আমাদের সম্মানিত রাজনীতিবিদরা সেই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ধর্ম থেকে আমরা দেখতে পাই সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। তাই সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। 

সংলাপের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে সাবেক এই বিচারপতি বলেন, সংলাপ হচ্ছে আল্লাহর সুন্নত। তিনি মানুষ সৃষ্টির জন্য সংলাপের আয়োজন করেছিলেন, সেখানেও দ্বিমত ছিল। রাসুলের সুন্নাতও সংলাপ। বদরের যুদ্ধে তিনি সেই সংলাপের আয়োজন করেন। এম এ মতিন বলেন, সংলাপের কাজ হচ্ছে আলোচনা করা ও যা সিদ্ধান্ত হবে তা সবাইকে মেনে নেয়া। সংলাপ করতে হলে সকলের মতামত নিতে হবে। সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লিডারদের কাজই হচ্ছে শোনা। যাদের নেতৃত্ব দিবেন তাদের কথা শুনতে ও শিখতে হবে। তিনি বলেন, ইলেকশন পঞ্চবার্ষিক আতঙ্ক। এ থেকে উত্তরণ দরকার। এজন্য স্থায়ী আইন করতে হবে। অর্থাৎ বিরোধী দলের লোকদের হয়রানি করা যাবে না। 

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. রওনক জাহান বলেন, বড় দুটো দলের মধ্যে যে সংলাপ হতে হবে সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সংলাপের ব্যাপারে ঐকমত্য নেই। কিন্তু শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি, নিজ সংসদীয় এলাকার উন্নয়নের জন্য আর্থিক বরাদ্দ পাওয়া এবং নিজেদের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে ঐকমত্য আছে বড় দুই দলের মধ্যে। সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়নের ব্যাপারে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার ব্যাপারে অনড় অবস্থান লক্ষ্য করা হয়। আমি মনে করি, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য রাজনৈতিক ও আইনি সংস্কার দরকার। কিন্তু শুধু আইনি সংস্কার করেই সমস্যার সমাধান হবে না। একইসঙ্গে দরকার রাজনৈতিক সংস্কারের ইতিবাচক উন্নয়ন। নির্বাচনে পরাজিত দলের নেতাকর্মীদের জীবন-জীবিকা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য  থাকা দরকার।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বৃটিশ আমলে সীমিত পরিসরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে ব্যালট ছিনতাই বা কেন্দ্র দখলের কোনো সংবাদ আমরা শুনিনি। পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালে সামরিক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়েছিল। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে বলা হয়েছে, জনগণই হবে রাষ্ট্রের মালিক। অর্থাৎ বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আর গণতন্ত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা থাকলেও কমিশন তা প্রয়োগ করছে না। 

গাইবান্ধা-৫ নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ায় তা বাতিল করে দেয়ায় প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু ইসি’র ফৌজদারি মামলার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা মামলা করেনি। অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। ওই  নির্বাচনের পর কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছিল তা মানা হয়নি। কমিশন চাইলে দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতো। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছা থাকা দরকার। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। আমি মনে করি, বৃহত্তর সমঝোতার লক্ষ্যে সংলাপের বিকল্প নেই।

আলী ইমাম মজুমদার আরও বলেন, গণতন্ত্রের বাহন হচ্ছে নির্বাচন। সেজন্যই নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভালো মানুষ। তাদের পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো কী তারা পালন করতে পারছে? সাবেক এই সচিব বলেন, দুটি পক্ষের অনমনীয় অবস্থান থেকে আলোচনা করা যায় না। বসতে হবে খোলা মনে। রাজনৈতিক দলগুলো বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, ১/১১ হয়েছিল রাজনীতিবিদদের সমঝোতা না হওয়ার কারণে। 

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই জাতি হিসেবে আমরা সংকটের মধ্যদিয়ে পার করছি। ১৯৭৪ সালে তৈরি হওয়া সাংবিধানিক সংকট ১৯৯১ সালে সমাধান হয়েছে। আবার ২০০৬ সালে এসে আমরা নতুন সংকটে পড়ে গেলাম। ২০১৪ সালে আবার সংকট তৈরি হয়, যার শুরু হয়েছে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে। সংবিধান থাকলেও সাংবিধানিকতা নেই, প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। আমাদের সংশোধনীগুলো জনগণের কল্যাণে নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে আনা হয়েছে। কিন্তু আমরা আশাবাদী হতে চাই। আমরা মনে করি, পরিবর্তন দরকার, পরিবর্তন হতেই হবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমার ওপর আস্থা রাখুন, নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। আমি মনে করি, এখন আর সংলাপের পরিবেশ নেই। তাছাড়া সংলাপের লক্ষণও নেই। দেশের রিজার্ভ কমে ১৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলছেন, রিজার্ভ কোনো সমস্যা নয়। তাই সংলাপ করে লাভ কী? মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে। সরকারি দল আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবেশ নষ্ট করছে। বিগত ১৫ বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। তারপরও সংলাপ যদি হতে হয়, তাহলে সুনির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডা নির্ধারণ করতে হবে, যাতে আমরা ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে পারি।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক বলেন, বিভিন্ন পক্ষ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তোলা হলেও কোন প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে তা কেউ বলতে পারছে না। এর দায় শুধু সরকারি দল ও ক্ষমতাসীন জোটের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। অতীতে নানাভাবে রাজনীতিবিদদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, ২০১৩-১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও চালানো হয়েছে। আমি মনে করি, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে একটি ঐকমত্য তৈরি হওয়া দরকার। কিন্তু নৈরাজ্য সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। 

বিএনপি’র সাবেক সংসদ সদস্য হারুর অর রশিদ বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষ্যে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। যারা সংলাপে বসতে রাজি নন, তারা মূলত সংকট এড়িয়ে যেতে চান। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার। 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সমপাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বাংলাদেশ আজ দ্বি-দলীয় বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দেশে সামপ্রদায়িকতা বাড়ছে, নির্বাচনী ব্যবস্থা নির্বাসনে চলে গেছে।  অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ৫টি ভিন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সংঘাতের আশঙ্কা শোনা যাচ্ছে। আমরা মনে করি, সংঘাত এড়াতে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। শত্রুর সঙ্গেও সংলাপ হতে পারে। 

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ চাইলেও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবে না। কারণ এখানে আরও অনেক স্টেকহোল্ডারের স্বার্থ রয়েছে। আমাদের রিজার্ভ কমছে, রেমিট্যান্স করছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২৪ হাজার কোটি টাকা, এখন তা ৪ লাখ কোটি টাকা। এখানে দলীয় লোকেরাই সুবিধা পাচ্ছে। এখানে ফায়দা তন্ত্রের রাজনীতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সহ-সাধারণ সমপাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, আমরা এখন সেল্‌ফ সেন্সরশিপের মধ্যে বসবাস করছি। আমাদের মনে সব সময় একথা বিরাজ করে, কথা বললে বিপদ হবে না তো। আমরা মনে করি, সংলাপেই সমাধান হওয়া দরকার। 

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নিজের দলকে নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্য দাবি করে নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে বলেন, নির্বাচন কমিশন আমাদের দলকে নিবন্ধন দেয়নি। সরকারি একটি এজেন্সি আমাদেরকে বলেছিল সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করলে আমাদেরকে নিবন্ধন দেয়া হবে। আমরা সরকারের অধীনে ভোটে যেতে না চাওয়ার কারণে নিবন্ধন দেয়া হয়নি। এই নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ডহীন। 

সভায় সুজনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ তুলে ধরেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। একটি অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ তথা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক সমঝোতা। 
জাতীয় সনদে কী কী বিষয়সমূহ সন্নিবেশিত হতে পারে তার মধ্যে আছে নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচনকালে অংশীজনদের ভূমিকা ও নির্বাচন পদ্ধতি, নবনির্বাচিত সরকারের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ, গঠনমূলকভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক দল, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার,  দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, কল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠন, নারীর ক্ষমতায়ন, তরুণদের জন্য বিনিয়োগ, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, আলাপ আলোচনার মধ্যদিয়ে সংকট মোকাবিলা।