দেশের ৮০% প্রবীণ অসংক্রামক রোগে ভুগছেন: গবেষণা

প্রথম নিউজ ডেস্ক: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া) ও বিষণ্নতার মতো অসংক্রামক রোগে দেশের ৮০ শতাংশ প্রবীণই (৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব) ভুগছেন। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২১’ উপলক্ষে শুক্রবার আয়োজিত এক ওয়েবিনারে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। ওয়েবিনারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘লিঙ্কিং ইউথ টু দ্য ওয়াইজ ফর ডিজিটাল ইকুইটি অ্যান্ড কেয়ার’।
‘দ্য গ্লোবাল হেলথ নেটওয়ার্ক এশিয়া’ এবং ‘ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ’ আয়োজিতহ এই ওয়েবিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও ইনিশিয়েটিভ ফর ননকমিউনিকেবল ডিজিজেসের প্রধান আলিয়া নাহিদ।
দেশব্যাপী পরিচালিত এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রবীণদের প্রতি দুজনের মধ্যে একজন যেকোনো একটি অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। এ ছাড়া, প্রবীণ পুরুষদের (৩৭%) তুলনায় প্রবীণ নারীদের (৫৪%) অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের হার অনেক বেশি।
এ ছাড়া দেখা গেছে, গত ৬ মাসে প্রবীণ ব্যক্তিরা প্রতি তিনজনের একজন (৩৫%) নিকটস্থ ওষুধ বিক্রেতার কাছে গেছেন চিকিৎসাসেবার জন্য, ৩৬ শতাংশ গেছেন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে, আর ১৭ শতাংশ সেবা নিয়েছেন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে।
প্রবীণদের সর্বশেষ ৬ মাসের স্বাস্থ্যসেবার গড় খরচ ছিল ২ হাজার ৪২৯ টাকা। এই প্রবীণদের ৩০ শতাংশ এখনো নিজেরা আয় করেন, যা থেকে তাঁরা চিকিৎসার খরচ চালান। যাঁরা নিজেরা আয় করেন না, তাদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের ৪ জন চিকিৎসা খরচের জন্য সন্তানদের আয় কিংবা নিজস্ব সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল।
উল্লেখ্য, গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ শতাংশ সরকারি সামাজিক সুরক্ষার ভাতা (বয়স্ক বা বিধবা) পেয়ে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে গবেষণা দলের প্রধান আলিয়া নাহিদ বলেন, ‘আমরা দেশব্যাপী ২ হাজার ৭৮৫ জন প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে একাধিক অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের একটা চিত্র পেয়েছি, যা বেশ উদ্বেগজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ আদমশুমারি ২০১১ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ প্রবীণ ছিল, যেটি ২০৪১ সালে দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে ধারণা। সে জন্য প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাকে তাদেরও দোরগোড়ায় নেওয়া উচিত এবং সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে নতুন উদ্ভাবনী ব্যবস্থার মাধ্যমে যুবকদের প্রবীণদের সেবায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আলিয়া নাহিদ।
ওয়েবিনারে একটি ভিডিও বার্তায় আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ প্রবীণদের মধ্যে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘অসংক্রামক রোগ এবং যেসব রোগ প্রবীণদের মধ্যে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, সেসব মোকাবিলার জন্য আমাদের আরও গবেষণা এবং সহযোগিতামূলক কাজ করতে হবে।’
ওয়েবিনারে প্রবীণদের সেবাকে আরও কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো-ইপিডিমিওলজি ও গ্লোবালএইজিংয়ের অধ্যাপক ব্লোসম স্টেফান।
প্রবীণদের সেবা আরও উন্নয়নের লক্ষ্যে গবেষণা ও তথ্য–প্রমাণভিত্তিক জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রবীণসংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে অংশীদারত্ব তৈরি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করেন তিনি।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কীভাবে উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ, নেপাল ও যুক্তরাজ্য থেকে গবেষক, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্যানেল আলোচনায় তাদের মতামত তুলে ধরেন।
এই প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ রোবেদ আমিন।
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কার্যক্রম এবং এই সেবাকে আরও কীভাবে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছানো যায়, তা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে বলে তিনি জানান।
ঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য (একাডেমিক) ও রেসপাইরেটরি মেডিসিনের অধ্যাপক এ কে এম মোশাররফ হোসেন করোনা মহামারির সময়ে একাধিক অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত প্রবীণের চিকিৎসা দিতে গিয়ে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা উল্লেখ করেন।
প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন নেপাল পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক লোচানা শ্রেষ্ঠা, নেপালের পাটান একাডেমির ইমার্জেন্সি মেডিসিনের প্রভাষক সুনীল অধিকারী, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল হেলথ নেটওয়ার্কের ডিরেক্টর অধ্যাপক ট্রুডি লাং।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন নেপালের পাটান একাডেমির সহ–উপাচার্য রাজেশ নাথ গোঙ্গল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মো. জাহিদ হোসেন ও নেপাল পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মহেশ মাস্কি।
ওয়েবিনারে অসংক্রামক রোগের গবেষণা ও সমাধানে সাউথ-সাউথ সহযোগিতার ভিত্তিতে গঠিত ‘গ্লোবাল ইনোভেশন হাব ফর মাল্টিমর্বিডিটি’ নামের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন করেন আইসিডিডিআরবির হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড পপুলেশন স্টাডিজ ডিভিশনের সিনিয়র ডিরেক্টর অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডি রিডপ্যাথ।
‘গ্লোবাল ইনোভেশন হাব ফর মাল্টিমর্বিডিটি’ শীর্ষক প্ল্যাটফর্মটি আইসিডিডিআরবি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেপালের পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন ও পাটান একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
য়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডি রিডপ্যাথ। ওয়েবিনারটিতে দেশ ও বিদেশের গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিক, টেলি-স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, যুব সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা প্রবীণ ব্যক্তিদের মাল্টিমর্বিডিটি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি অন্যান্য খাতকেও সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করেন।